নবরূপ
-শ্রী পবিত্র কুমার চক্রবর্ত্তী
*************************
একদা এক শৃগাল কোন এক গৃহস্থের বাড়ি থেকে একটি মুরগি চুরি করিয়া বাড়ির পাশেই এক গর্তের মধ্যে বসিয়া মনের আনন্দে মুরগি খেতে ছিল। ঐ বাড়ির গৃহস্থ জীবিকা নির্বাহের জন্য রঙের কাজ করত। সেই কারণে সাধারণ মানুষ তাহাকে রঙ মিস্ত্রি বলেই জানত।
যাই হোক,তো রঙ মিস্ত্রি রঙ মেশানো কিছু জল ভুল ক্রমে ঐ গর্তে লুকানো শৃগালের দিকেই ছুঁড়ে মারল। যেই না রঙ গিয়ে ঐ শৃগালের উপড়ে পড়ল,আর শৃগালতো ভয়ে খুব জোরছে দৌড়ে পালালো। পালালো এই ভেবে যে,ঐ রঙ মিস্ত্রি তাহাকে আবার মারতে আসল কি না এই ভেবে!
দৌড়তে দৌড়তে শৃগালটি যখন নিজ সম্প্রদায়ের গুহায় গিয়ে হাজির হল,তখনতো সকল শৃগালে আগত শৃগালকে দেখে একেবারে হতবাক্ হয়ে পড়ল, আর সকল শৃগালে আগত শৃগালের নবরূপ দেখিয়া বলল- ওহে প্রভু, কোথা হতে কি হেতু আগমন করলের এই পাপীদের দ্বারে কৃপা করে বলুন?
এখন আগত শৃগালটিতো চিন্তায় পড়ে গেল আর ভাবিল, কি ব্যাপার !তাহারা আমাকে প্রভু বলিল কেন?
আগত শৃগাল ষকিয়দ্ ক্ষণ চিন্তা ভাবনা করিয়া নিজের শরীরের দিকে লক্ষ করিয়া দেখিল যে, ঐ যে রঙ মিস্ত্রির ছুঁড়েমারা রঙ তার শরীরে এসে পড়ায় এখন একটি নবরূপ ধারণ করিয়াছে। সে কারণেই এখন একটু প্রভু প্রভু ভাব লাগছে। এই কারণেই সকল শৃগালগণ তাহাকে প্রভু বলিয়া সমাদর করিতেছে।
শৃগালটি ভাবিল স্থির সিদ্ধন্ত নিল! এই সুয়োগ যায়- এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে আজ থেকে প্রভু হয়ে যাব।
এইবার চতুর শৃগাল বুদ্ধি করে সকল শৃগালের প্রতি বলিল- হে ভক্তগণ, তোদের আতিথেয়তায় আমি মুগ্ধ। আমি বহু কাল ধরে পাহাড়ের গুহায় কঠিন সাধনা করেছি। তাই পরম দয়াল আমার সাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে এই নবরূপ দান করেছেন। আর বলেছে ,আমি যেন সকলকে ব্রহ্ম জ্ঞান প্রদান করি। তাইতো তোমাদের কাছে ছুটে আসা ভক্তগণ।
তখন অন্য শৃগালেরা বলিল - বেশ করেছেন প্রভু!আঃহ!কত সুন্দর মুখশ্রীত বানী,একেবারে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। হে প্রভূ, কতই না পুণ্যের ফলে আজ আপনার দর্শন লাভ করেছি।,আর আপনার পদরেনু দ্বারা ধন্য করেছেন আমাদের এই গৃহদ্বার। তাই আমরা সকলেই ধন্য প্রভূ। দয়াকরে বলুন কি সমাদর করিতে পারি আপনার জন্য! আর আপনি দয়া করে কিছুদিন আমাদের এই গরীবের জীর্ণ কুটিরে থেকে গেলে আমরা সকলেই কৃতার্থ হব প্রভূ।
আগত প্রভু শৃগাল বলিল- ঠিক আছে বৎসগণ,তোমরা যখন এত করেই বলছ তবে তাই হবে। তবে বৎসগণ,আমার কিছু চাহিদা আছে তোমরা কি তাহা রক্ষা করতে পারবে?
এক শৃগাল বলিল - ঠিক আছে প্রভু, আপনি যাহা বলবেন আমরা তাহাই করব। আজ থেকে আমাদের একমাত্র কর্মই হবে আপনার সেবা যত্নাদি করা। বলুন প্রভূ, আমরা কি করতে পারি আপনার জন্য।
আগত শৃগাল মনে মনে ফন্দি আঁটিয়া বলিল- ঠিক আছে বৎসগণ,প্রত্যেহ আমাকে একটি করে ডাশা ডাসা মুরগি দিতে হবে,বড় বড় সুন্দর সুন্দর কাঁকড়া দিতে হবে ,কচি কচি কুকুর ছানা দিতে হবে এবং আমার সেবার জন্য দাস দাসী দিতে হবে ,তবেই আমি তোমাদের এখানে কাল যাপন করব, আর না হয় অন্যত্র চলে যাই।
তৎক্ষণাৎ এক শিয়াল বলিল - না প্রভু,আপনি আমাদের এখানেই থাকবেন। আপনার সকল চাহিদাই আমরা সাধ্য মত পুরণ করতে চেষ্টা করব।
সেই দিন হতেই সকল শৃগাল সমবেত হয়ে প্রভূ শৃগালের সেবায় নিয়োজিত হয়ে গেল।এই ভাবে অনেক দিন গত হয়ে গেল।
একদিন প্রভু শৃগাল গর্তের পাশে বসে কুকুর ছানা মন আনন্দে খেতে লাগল।এমন সময় সন্তান হারা একটি কুকুর তার ছানাটিকে উদ্ধারের জন্য যেই দৌড়ে আসিল,শৃগালতো কুকুরকে আসতে দেখে ভয়ে দৌড়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচানোর জন্য এক পুকুরে ঝম্প দিয়ে পড়ল। কুকুরটি তাহা অবলোকন করে ব্যার্থ হয়ে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পরে যখন শৃগালটি পুকুরের পাড়ে উঠিয়া বসিল,প্রভূ শৃগালকে খুঁজতে আসা সকল শৃগালেরা প্রভুকে জলে মলিন অবস্থায় দেখিতে পেল। সবাই দেখল যে,এখন আর প্রভুর শরীরে সেই আগের মত রঙ নাই।
সবাই ভাবতে লাগল! কি ব্যাপার ! ঘটনা কি! প্রভূর শরীরে আগের মত আর রঙ নাই কেন? তবে কি নকল রঙ লাগানো ছিল?
তখন সকল শৃগালেরা চিন্তা করিয়া বুঝতে পারল যে ,আসলে সেতো চালাকি করে তার শরীরে রঙ মেখে আমাদের সাথে প্রতারনা করে সমস্ত সুখ ভোগ করেছে! সর্বনাশ!
নাঃ! তারে এইবার শিক্ষা দেওয়া উচিৎ । কি বল তোমরা সবাই?
সকল শৃগালে উত্তরঃ করিল। হাঁ হাঁ, তাহাকে উচিৎ শিক্ষাই দেওয়া উচিৎ ।
এক শৃগাল বলল- ধর সকলে এই প্রবঞ্চককে,আজ তাহাকে উচিৎ শিক্ষাই দেব আমরা।
এই বলে সকল শৃগালে একত্রিত হয়ে প্রভু শৃগালকে উত্তম মধ্যম দিতে লাগল।
আরপ্রভূ শৃগাল মাগো বাবাগো করে চিৎকার করতে লাগল।
রূপ দেখে ভুল করো না,
সব রূপতো আসল হয় না।

Comments
Post a Comment